শুরুতেই আবার বিতর্কের মুখে পড়লো খুলনার ওয়াসার আলোচিত পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ এর কার্যক্রম। গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম সচিব ফিরোজ শাহকে। এর আগে তাকে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়।
বিশেষায়িত প্রকৌশল জ্ঞান সমৃদ্ধ একটি প্রকল্পের দায়িত্ব প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে পদায়নের পর বদলী হয়ে খুলনার একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই তার খুলনায় বদলী।
এদিকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ফিরোজ শাহকে পিডি করা হলেও প্রকল্প তদারকির মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে। এর আগে রেজাউলকে পিডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রেজাউলকে পিডি করায় এনিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। পরে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। তিন মাসের ব্যবধানে ঘুরে ফিরে সেই রেজাই আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের মূল ভূমিকায় চলে আসলো।
এদিকে প্রকল্পের প্রথম প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ঠিকাদারের কাছে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। চীনের প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো লিমিটেড (সিসিএসইবি) ও আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজটি পেয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য তাদের ২০ লাখ টাকা বাড়তি দিতে হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ওয়াসা থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২। বিশাল ব্যয়ের এই প্রকল্পের পিডি কে হবেন-এনিয়ে শুরু হয়ে দৌড়ঝাপ। শুরুতেই প্রকল্প তদারকির রুটিন দায়িত্বে ছিলেন ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেন। প্রথম প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং অভিজ্ঞ হওয়ায় তাকে প্রকল্পের ফোকালপার্সন নিয়োগ করা হয়।
কিন্তু গতবছরের ১০ ডিসেম্বর ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে গিয়ে মব তৈরি করেন এনসিপি নেতারা। তারা নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রকল্পের দায়িত্ব দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির এক নেতাও রেজার পক্ষে জোরালো তদবির করেন। পরদিন ১১ ডিসেম্বর রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং আটরা রিজার্ভার নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এছাড়া তিনি ছিলেন ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা, এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা তার ছিল না। মূলত মন্ত্রণালয়ে ঘুষ এবং বিএনপির এক প্রতিনিধির সুপারিশে তিনি নিয়োগ পান। এনিয়ে ওয়াসার ভেতরে-বাইরে ক্ষোভ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় গত ২৬ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর প্রকল্পটির পরিচালক হতে তৎপরতা চালান বিএনপি সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সের (অ্যাব) নেতারা।
এর মধ্যে গত ২৪ মে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন যুগ্ম সচিব ফিরোজ শাহ। ওয়াসার আগে তিনি খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে সার্ভেয়ারদের বদলী, বটিয়াঘাটার একটি খাস জমি জেএমআই নামে একটি গ্যাস কোম্পানিকে দিয়ে দেওয়া এবং সরকারি জমি সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি তাকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে বদলী করা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, সাধারণত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য থাকে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন শেষে সচিবালয়ে বদলী হওয়া। কিন্তু ওয়াসার দায়িত্ব নিতে ফিরোজ শাহ মন্ত্রণালয় থেকে বদলী হয়ে খুলনা চলে আসেন। এরপর থেকেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিতে তৎপরতা শুরু করেন।
এনিয়ে দেনদরবার চলা অবস্থায় গত ২৮ জুন অ্যাব খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়। খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা ছিল এটাই প্রথম।
শেষ পর্যন্ত সবাইকে পেছনে পেলে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের চিঠি নিয়ে আসেন ফিরোজ শাহ। গত ২৯ জুলাই তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার পর রেজাকে প্রকল্পের প্রকৌশলগত কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সূত্রটি জানায়, পূর্বের মতো সংবাদ প্রকাশ হলে নিয়োগ ও প্রকল্পের দায়িত্ব ভেস্তে যেতে পারে-এমন আশংকায় সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেতিবাচক প্রতিবেদন ঠেকাতে ঠিকাদারের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি ছোট কর্মচারী। এসব বিষয়ে স্যারেরা ভালো জানেন। তার সঙ্গে কথা বলেন। না হলে অফিস টাইমের পরে নিরিবিল এক সময় আসেন, আমি কথা বলিয়ে দেব।’
বক্তব্য জানতে কার্যালয়ে গেলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে ফিরোজ শাহ স্বাক্ষাত দেননি। ফোন করা হলে সাংবাদিক শুনে তিনি লাইন কেটে দেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

